বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় প্রতিনিয়ত নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে বন বিভাগকে। এবার বনের খালে বিষ প্রয়োগ করে মাছ শিকারের প্রতিবাদ করায় বনকর্মীদের ওপর চড়াও হয়েছেন অপরাধীরা। শুধু তাই নয়, বন বিভাগের অভিযানে হামলা ও হেনস্তার ঘটনায় নতুন করে যুক্ত হয়েছে নারী অপরাধীদের সম্পৃক্ততা—যা ভাবিয়ে তুলেছে বন কর্মকর্তাদের।
বাধা দেওয়ায় বনকর্মীদের ওপর হামলা
ঘটনার সূত্রপাত সুন্দরবনের একটি প্রত্যন্ত খালে বিষ প্রয়োগ করে মাছ শিকারের সময়। বন বিভাগের টহল দল হাতেনাতে তাদের আটকানোর চেষ্টা করলে পরিস্থিতি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। অভিযোগ রয়েছে, পুরুষদের পাশাপাশি নারীরাও দলবদ্ধ হয়ে বনকর্মীদের ওপর চড়াও হন এবং সরকারি কাজে বাধা সৃষ্টি করেন।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ায় জীবন রক্ষার্থে পিছু হটতে বাধ্য হন বনকর্মীরা। পরবর্তীতে সহকারী বন সংরক্ষকের (এসিএফ) নির্দেশে অতিরিক্ত জনবল নিয়ে ঘটনাস্থলে পুনরায় স্টেশন কর্মকর্তা ও টহল দল পৌঁছালে তাদের ওপরও হামলার চেষ্টা চালানো হয়। শেষ পর্যন্ত জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অভিযুক্তদের ফেলে যাওয়া নৌকা, জাল, বিষের খালি বোতল এবং বিষযুক্ত মাছ জব্দ করে ফাঁড়িতে ফেরেন বনকর্মীরা।
ধ্বংস হচ্ছে জলজ বাস্তুতন্ত্র
বন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সুন্দরবনের খালে বিষ প্রয়োগের নেতিবাচক প্রভাব কেবল সাময়িক মৎস্য নিধনেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি গোটা জলজ বাস্তুতন্ত্রকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। বিষাক্ত chemicals-এর প্রভাবে মুহূর্তেই মারা পড়ছে নানা প্রজাতির ছোট মাছ, পোনা, চিংড়ি ও অন্যান্য জলজ প্রাণী।
খাদ্যশৃঙ্খলে এর মারাত্মক ব্যাঘাত ঘটায় সুন্দরবনের অন্যান্য বন্য প্রাণীর জীবনও হুমকির মুখে পড়ছে। বিষের ক্রিয়ায় দুর্বল হয়ে ভেসে ওঠা মাছ খুব সহজেই তুলে নেন জেলেরা। এতে সাময়িক ফায়দা মিললেও চিরতরে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে মাছের প্রজনন ও বংশবিস্তারের স্বাভাবিক পরিবেশ। এছাড়া তলদেশে পচে যাওয়া জলজ প্রাণীর সঠিক হিসাব না পাওয়ায় ক্ষতির প্রকৃত চিত্রও আড়ালে থেকে যাচ্ছে।
নতুন মোড়: অপরাধ চক্রে নারীর উপস্থিতি
সুন্দরবনে হরিণ ও বন্য প্রাণী শিকার রোধে বন বিভাগের লাগাতার অভিযানের কারণে অপরাধ প্রবণতা কিছুটা কমলেও বিষ দিয়ে মাছ শিকার বন্ধ করা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। তবে বর্তমান ঘটনার সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো—এই অপরাধে নারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ। বন বিভাগের দীর্ঘদিনের ইতিহাসে বিষদস্যু হিসেবে নারীদের সম্পৃক্ততা পাওয়ার ঘটনা এটাই প্রথম বলে জানিয়েছেন জোংড়া টহল ফাঁড়ির দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. মতিউর রহমান।
সুন্দরবন পূর্ব বিভাগের বাগেরহাটের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) এই ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তার মতে, বনকর্মীদের ওপর এই ধরনের আক্রমণাত্মক আচরণ সুন্দরবন সংরক্ষণের পথে সবচেয়ে বড় অন্তরায়।
সংকট উত্তরণে করণীয় কী?
আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি শুধু নিয়মিত টহল বা মামলা দিয়ে যে এই অপরাধ পুরোপুরি দমন করা সম্ভব নয়, তা স্বীকার করছেন খোদ বন কর্মকর্তারা। সুন্দরবনের মৎস্যসম্পদ বাঁচাতে কিছু সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেওয়ার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে:
সরবরাহ বন্ধ করা: বনের ভেতরে বিষ ও ক্ষতিকর রাসায়নিকের উৎস খুঁজে বের করে এর সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ করতে হবে।
জালের মতো নেটওয়ার্ক ভাঙা: অপরাধীদের মূল হোতা ও চক্রের নেটওয়ার্ক চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে হবে।
জনসম্পৃক্ততা: স্থানীয় সৎ জেলে ও বনজীবীদের এই নজরদারি কার্যক্রমে সম্পৃক্ত করা জরুরি।
নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ: বনকর্মীদের ওপর হামলা রোধে তাদের প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা সরঞ্জাম এবং জনবল আরও বাড়াতে হবে।
সব মিলিয়ে, সুন্দরবনের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে কেবল প্রশাসনিক অভিযান নয়, বরং সামাজিক প্রতিরোধ এবং কঠোর নজরদারির বিকল্প নেই বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।